গোবিন্দপুর ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন
আধুনিক কলকাতার প্রথম কেন্দ্র গড়ে ওঠে গোবিন্দপুরে। এর নামকরণ হয় গোবিন্দের মন্দির থেকে, যা তৈরি করেছিলেন Saraswati ও Nadia নদীর কিনারায় গ্রাস পাকাপোক্ত হওয়ার পর প্রায় ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে এক Sett পরিবার ও চার Bysack ব্যাবসায়ী পরিবার। ভাঙরী ও মাটি জমে নদীর পূর্ব তীর কৃষি উপযোগী ও বসবাসের উপযোগী হওয়ায় তারা সুন্দরী বন উজাড় করে ঘরবাড়ি বানালেন এবং নতুন তৈরি হওয়া খালে মাছ ধরার নৌকা রাখলেন। ফলে মন্দিরের নামই হয়ে উঠল ঐ এলাকার ব্যবসায়িক পরিকল্পনার প্রতীক—গোবিন্দপুর—আজকের ফোর্ট উইলিয়ামের অঙ্গনে।
সুতানুতি: সুতা-বাট এর বাজার থেকে গ্রামের নাম
গোবিন্দপুরের উত্তরে ছিল সুতানুতি, নামটিই এসেছে ‘সুতা’ (সুতা) ও ‘নুতি’ (বাটল) থেকে, পরে ইংরেজি উচ্চারণে হয়ে গেছে “Cottonpōls”। এই নামই তুলে ধরে গ্রামের কাপড়ের সুতা-বাটের বাজারি স্বরূপ: স্থানীয় তাঁতীরা ও আসা ব্যবসায়ীরা এখানে সুতা-বাট ও বায়া কাপড় বিনিময় করতেন। পাশের খাল আর ঘাট—যেমন হাতখোলা ও চুট্টানুতি—ব্রিটিশ অঙ্গরাজ্যে এ ব্যবসায়িক পরিচিতি বহন করে চলল, এমনকি জব চার্নকও এখানে নামে পৌঁছেছিলেন। “সুতানুতি” নামটিই স্মরণ করিয়ে দেয় প্রাথমিক প্রাত্যহিক শিল্পী অর্থনীতি, এবং ঐ নামেই বেঁচে আছে কলকাতার প্রথম বস্ত্রবাজারের ইতিহাস।
“কল-কাটা”: কাটা উপকূলরেখা
গোবিন্দপুর ও সুতানুতির মধ্যে ছিল খালের গহ্বর ও জোয়ার-ভাটা দ্বারা কাটা এক সরু উপকূলরেখা। বাঙালি লোকে এটিকে ডেকে merely “কল-কাটা”—কল মানে উপকূল, কাটা মানে কাটিয়ে দেওয়া। ধীরে ধীরে কল-কাটা পুরষ্কৃত হয় পর্শিয়ান ভাষায় “কল্পত্তা” (সম্প্রদায়ের হিসাবনিকাশে c. ১৫৮২ সালে Ain-i-Akbari-তে “Kalkatta” নামে উল্লেখ পাওয়া যায়), আর ইংরেজিতে প্রায় ১৬৮০-এর দিকে “Calcutta” রূপে। ধ্বনিগত সহজানুভূতির কারণে ‘কল’ থেকে ‘কাল’ হয়ে, ‘কাটা’ থেকে ‘কাটা’ দীর্ঘ হয়ে ইংরেজিতে ‘Calcutta’ রূপ নেয়। কল-কাটা বলতে মূলত দুটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা স্থান বোঝায়—এক সারি নদী ও উপকূলের সংমিশ্রণ—যা নদীদ্বারিত দৃশ্যের সঙ্গে খুব মানানসই নামে পরিণত হয়েছিল।
ভুল ব্যাখ্যার পর্যালোচনা
অনেকে বিভিন্ন অযৌক্তিক উৎপত্তি-স্থানীয় ব্যাখ্যা দিয়েছে: কালীঘাট (কালী মন্দির), কালি-কাটা (“চুন-ভাট্টা”), খাল-কাটা (“কাটা খাল”), এমনকি “কোল গোত্রের বসতি” ইত্যাদি। এগুলি ভাষাতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন। যেমন, কালীঘাট মন্দির তো ১৮০৯ সালে তৈরি, আর সেটা ‘কালিকাতা’ রূপে বিকৃত হতে পারত না; চুন-ভাট্টার কোনো প্রাচীন নজির নেই; খাল-কাটার ক্ষেত্রে ‘খাল’ শব্দ প্রকৃত খাল বোঝায়, খননের কারিগরি অর্থে নয়; আর কোল গোত্রের সংযোগ দেয় তো জনসংখ্যা ও বাংলা প্রচলনের সঙ্গে ধরা পড়ে না।
প্রাচীন সাহিত্য ও মানচিত্রে উল্লেখ
কলঘট্টার প্রথম বাংলা উল্লেখ মেলে প্রায় ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে Alaol-এর “পদ্মাবতী”-তে, কিন্তু Manasamangal-এর ১৫ শতকের কোনো রচনায় ‘কালিকাতা’ নেই। এটা নির্দেশ করে যে কল-কাটা রূপান্তর ঘটেছে ১৭ শতকে, সম্ভবত পারস্য প্রশাসনিক নথি ও ইউরোপীয় মানচিত্রের প্রভাবেই। D’Anville-এর ১৭৫২ সালের মানচিত্রে “Caiicolta” এবং van den Broucke-এর ১৬৬০ চিত্রে (১৭২৬ সালে মুদ্রিত) “Collecatte” দেখা যায়। ১৬৮৮–৮৯ সালের ইংরেজি চিঠিতে “Calcutta” ব্যবহৃত হয়েছে, যা কোম্পানির ইংরেজি পর্যায়ে দ্রুত গৃহীত আঞ্চলিক রূপ।
বহুভাষিক পরিভাষা ও আধুনিক মান্যতা
২০১১ সালের পদযাত্রায় ‘Calcutta’ থেকে ‘Kolkata’ রূপান্তর ঘটিয়ে পুনরায় স্থানীয় উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নিয়ন্ত্রিত নামকরণ করা হয়। বর্তমানে শহরকে “Kolkata” বলে স্বীকার করে মূল বাংলা টোপোনিমের—কল-কাটার—ধ্বনিগত শিকড়কে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত ও স্মরণীয় করা হয়েছে।
Source: Biswas, Oneil. (1992). Calcutta and Calcuttans. Calcutta: Firma KLM Pvt Ltd.
